ছাত্র রাজনীতির দুষ্টচক্র: কেন সহিংস এই ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা দরকার

আরমান মিয়া | 10 September 2025
No image

বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতি একসময় ছিল স্বপ্ন, পরিবর্তন, আর নতুন নেতৃত্ব তৈরির জায়গা। অতীতের অনেক বড় নেতা, শিক্ষক-গবেষক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সাংস্কৃতিক কর্মী— প্রায় সবাই ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে এসেছেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই জায়গয়াটি ধীরে ধীরে দুষ্টচক্রে আটকে গেছে। ছাত্ররাজনীতির  যে জায়গা তরুণদের ভেতর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার কথা ছিল, সেটাই এখন অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতা, দখল, টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজি, ভয়-ভীতি আর অপরাধের কেন্দ্র হয়ে উঠছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এ পরিস্থিতে করণীয় কী?  

দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় ছাত্র সংগঠনগুলো পরিচালিত হয়।  যার ফলে ছোট-বড় সংঘর্ষ, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন হল/হোস্টেলে কে থাকবে, কে মিছিলের সামনে থাকবে—এসব নিয়ে শুরু হয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ধীরে ধীরে এই প্রতিযোগিতা শক্তির প্রদর্শন আর দখলদারিতে পরিণত হয়। অনেক জায়গায় দেখা যায়, প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীকে কোনো না কোনো গ্রুপে জোর করে টেনে নেওয়া হয়। পরিচয় হয় “সিনিয়রিটি” আর “গ্রুপিং”-এর মাধ্যমে। যারা যোগ দেয় না, তারা কখনো নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। আবার যারা যোগ দেয়, তারা ধীরে ধীরে একটি সহিংস পরিবেশে নিজেদের মানিয়ে নিতে বাধ্য হয়। অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্র, মারামারি, চাঁদাবাজি, হল/হোস্টেল দখল—এসবের সঙ্গে পরিচয় হয়ে যায় খুব তাড়াতাড়ি। ফলে ছাত্ররাজনীতি হয়ে ওঠে এক ধরনের সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য—যেখানে নতুনদের ধীরে ধীরে সহিংস ধাঁচে অভ্যস্ত করা হয়। যে তরুণরা দেশের জন্য ভালো কিছু করতে চেয়েছিল, তাদের অনেকেই এই চক্রের ভেতর পড়ে নিজস্ব লক্ষ্য হারিয়ে ফেলে। 

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বর্তমানে নেতৃত্ব তৈরির  সুস্থ কাঠামো এখন বেশ দুর্বল। ছাত্র সংগঠনগুলোর ভেতরে  নির্বাচন খুব কম হয়। দায়িত্ব পেতে হলে যোগ্যতা বা দক্ষতার চেয়ে “কার প্রতি বিশ্বস্ত”—এটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে—যুক্তিভিত্তিক রাজনীতি শেখা হয় না, আলোচনার সংস্কৃতি নষ্ট হয়, সমালোচনা সহ্য করার মানসিকতা কমে যায়। ক্যাম্পাসভিত্তিক ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলো নিয়মিত না হওয়াতে সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন এর একছত্র প্রভাব বিদ্যমান থাকে। দলীয় প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে সহিংসতার পরিমাণ বেড়ে যায়। এ অবস্থায় ভালো নেতৃত্ব  তৈরি হওয়ার সুযোগ কমে যায়। বরং যাদের পেশি শক্তি বেশি নিয়ন্ত্রণ থাকে তাঁদের হাতেই। দেশব্যাপী বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যা ঘটেছে, তার অনেক উদাহরণই এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় বা ক্যাম্পাসের অধিকাংশ শিক্ষক সরাসরি রাজনীতির সাথে জড়িত। নিজ দলের শিক্ষার্থীরা অন্যায় করলেও কোন প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয় না বা নিতে পারে না। আর বিশ্ববিদ্যালয় বা ক্যাম্পাসের সহিংসতার পিছনে দায়ী শিক্ষার্থীদের বিচারিক সংস্কৃতি নাই বললেই চলে। যার ফলে সহিংসতা আর লেজুড়বৃত্তি বেড়েই চলছে।  

এই সহিংস পরিবেশ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, মানসিক স্বাস্থ্য, আর ভবিষ্যৎ ভাবনাকে সরাসরি প্রভাবিত করে।  ছাত্র সংগঠনগুলোর সহিংসতার জন্য অনেক শিক্ষার্থী নিরাপত্তাহীনতা্য ক্যাম্পাসে যেতে ভয় পায়। হল/হোস্টেলে থাকতে না চেয়ে বাইরে থাকে ফলে অনেকে আর্থিক সংকটে ভোগে। স্বাধীন মত প্রকাশ করতে সাহস পায় না, অনেকে সাংস্কতিক, ধর্মীয় স্বাধীনতা হারায়। শিক্ষার্থীরা তাঁদের ভিতরকার সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে ব্যর্থ হয়। ফলে ক্যাম্পাস শেখার জায়গা  না হয়ে চাপ, ভয় আর অস্থিরতার স্থান হয়ে উঠে। এ সব চাপের কাছে নতি স্বীকার করে অনেক শিক্ষার্থীর সেশন জট বা পড়াশোনা শেষ না করেই ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যেতে হয়। অনেক শিক্ষার্থী ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে নিয়মিত মানসিক অত্যাচার ও নির্যাতনের স্বীকার হয়ে মৃত্যুবরণ ও করেছে এমন নজিরও রয়েছে। ফলে ক্যাম্পাস পরিচিত হয়ে উঠে একটি আতংকের জায়গা হিসাবে। অভিভাবকরা তাঁদের সন্তানদেরকে ক্যাম্পাসে পাঠাতে অনীহা প্রকাশ করেন। এসব রাজনৈতিক অস্থিরতায় অনেক শিক্ষার্থী বিদেশে পাড়ি জমিয়ে আর দেশে ফিরে আসে না। যার ফলে দেশ হারাচ্ছে তার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ, যা দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।  

ক্যাম্পাসে দলীয় ছাত্র রাজনীতির বাইরে থেকেও যে নেতৃত্ব ও অধিকার নিয়ে কাজ করা  যায়  এর একটি বড় উদাহরণ হতে পারে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বদানকারী সংগঠন অক্সফোর্ড স্টুডেন্ট ইউনিয়ন। আমাদের দেশের প্রচলিত দলীয় লেজুড়বৃত্তি ছাত্র রাজনীতির বাইরেও  অনেক শিক্ষার্থী স্বাধীনভাবে রাজনীতি করতে চায়। তাঁরা চায় রাজনীতি হবে অংশগ্রহণমূলক, যুক্তিনির্ভর, উন্নয়নধর্মী ও সম্মানজনক। এজন্য দরকার দলীয় আদর্শভিত্তিক রাজনীতির বাইরে নতুন চিন্তার/ভিন্ন মাত্রার একটি অদলীয় প্ল্যাটফর্ম। একটি স্বাধীন  ও নিরপেক্ষ , অদলীয় প্ল্যাটফর্ম শিক্ষার্থীদের জন্য অবশ্যই দরকার। কারণ__  

•    স্বাধীনভাবে নেতৃত্ব তৈরির প্রশিক্ষণ দিতে পারবে—যেখানে কোনো রাজনৈতিক দলের চাপ থাকবে না।

•    যুক্তিনির্ভর আলোচনা, বিতর্ক, নীতি বিশ্লেষণ—এসব শেখানোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই চিন্তা করতে শিখবে। 

•    সহিংসতার পরিবর্তে সহযোগিতার চর্চা হবে। ভিন্ন মত ও আদর্শের শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে কাজ করতে পারবে। 

•    যার যার ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় রেখে ক্যাম্পাসভিত্তিক রাজনীতি করতে পারবে।  

•    দেশীয় সংস্কৃতি নির্ভর শিল্প ও কলা অনুশীলন করতে পারবে। 

•    ক্যাম্পাসভিত্তিক শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারবে, যেমন—হল বা হোস্টেলে আসন সংকট, ক্যান্টিনের খাবারের মানোন্নয়ন, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, আইনি সহায়তা প্রদান, দরিদ্র তহবিল গঠন, পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, লাইব্রেরি সুবিধা সম্প্রসারণ, খেলাধুলা এবং বিভিন্ন ক্লাবের কার্যক্রম পরিচালনা ও শক্তিশালীকরণ।

•    অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে একটি শক্তি হিসাবে কাজ করবে। 

•    দীর্ঘমেয়াদে এটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সাহায্য করবে, যা দেশে সুস্থ রাজনীতির পথ তৈরি করবে। 

ছাত্র রাজনীতি আমাদের দেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি পুরোপুরি বাদ না দিয়ে বরং এর ভেতরের দুষ্টচক্র ভেঙ্গে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে শিক্ষার্থীরা নির্ভয়ে মত প্রকাশ, চলাফেরার স্বাধীনতা পাবে। তরুণ রাজনীতিবিদরা সহিংসতার পথে না গিয়ে যুক্তি, নীতি, আলোচনা, এবং নেতৃত্বদানের জন্য কেবল যোগ্যতাকে মূল্যায়ন করবে। শিক্ষার্থীদের যে চিন্তা-ভাবনাগুলো দেশের কল্যাণে কাজে লাগবে সেগুলোকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য উপযোগী করে তুলবে। যাতে দলীয় লেজুড়বৃত্তির বাইরে গিয়ে দলমত নির্বিশেষে রাজনীতির সহিংসতার পথ বন্ধ করে  নিরাপদ, সৃজনশীল শিক্ষাঙ্গন গড়ে তোলা যায় ।



Comments