পরিবারের চার দেয়াল: নারীর নেতৃত্বের প্রশ্নে একটি উপেক্ষিত বাস্তবতা

শুহরাত রানা রুশমী | 13 August 2025
No image

পরিবারই হচ্ছে রাজনীতির প্রথম পাঠশালা এবং নারীর নেতৃত্বের প্রশ্নে এটি এক চরমভাবে উপেক্ষিত বাস্তবতা। বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বা নেতৃত্বের বিষয়টি যখনই আমাদের আলোচনায় আসে, আমরা সাধারণত কিছু গৎবাঁধা পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে কথা বলি। আমরা দেখি জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা কত, কতজন নারী সরাসরি নির্বাচনে জয়ী হয়ে আসছেন কিংবা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারী সদস্যদের উপস্থিতির হার কেমন। যদিও এই সংখ্যাগুলো রাজনৈতিক অগ্রগতির মানদণ্ড হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আলোচনার সবচেয়ে গভীর এবং মৌলিক স্তরটি প্রায়ই আমাদের দৃষ্টির আড়ালে থেকে যায়। সেই স্তরটি হলো পরিবার। রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে প্রবেশের অনেক আগেই একজন নারীর রাজনৈতিক সম্ভাবনা বা নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা গড়ে ওঠে অথবা অঙ্কুরেই সীমিত হয়ে যায় তার নিজ পরিবারের চার দেয়ালের ভেতরে। এই কারণে বলা যায় যে, পরিবারই হচ্ছে নারীর জন্য জীবনের প্রথম রাজনৈতিক পরিসর, যেখানে নির্ধারিত হয় তার আগামীর যাত্রাপথ।

রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পরিবার কেবল একটি স্নেহ-ভালোবাসার কেন্দ্র নয়, বরং এটি হলো রাজনৈতিক সামাজিকীকরণের প্রথম এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান। একজন শিশুর মনে রাজনৈতিক মানসিকতা, আদর্শ, মতামত গঠন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন কেমন হবে—তার প্রথম শিক্ষা সে তার পরিবার থেকেই পায়। এমনকি ক্ষমতার উৎস কী এবং কর্তৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধা বা প্রশ্ন করার ক্ষমতা কীভাবে কাজ করে, তা-ও সে পরিবারে বড়দের আচরণ দেখে শেখে। বাংলাদেশের মতো সামাজিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে পরিবারই হলো সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের মূল কেন্দ্রবিন্দু, সেখানে এই পারিবারিক প্রভাব আরও অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী ও গভীর। শৈশব থেকেই একটি কন্যাশিশু এবং একটি পুত্রশিশুর জন্য সমাজ ও পরিবার আলাদা আলাদা আচরণের ছক তৈরি করে দেয়। মেয়েদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয় যে সহনশীলতা, নীরবতা এবং আত্মত্যাগই হচ্ছে একজন নারীর শ্রেষ্ঠ গুণ। অন্যদিকে নেতৃত্ব প্রদান, উচ্চকণ্ঠে কথা বলা কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণকে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কেবল পুরুষালি গুণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। শৈশবের এই সামাজিকীকরণ, এটি নারীর অবচেতন মনে এক ধরনের হীনম্মন্যতা তৈরি করে এবং ভবিষ্যতে তার রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসকে বড় ধরনের সংকটে ফেলে দেয়। রাজনীতি তখন তাদের কাছে এক ধরনের 'অপ্রাসঙ্গিক' বা 'নিষিদ্ধ' ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত হতে শুরু করে।

আরেকটি মজার অথচ বেদনাদায়ক বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশের নারীরা প্রতিদিন তাদের পরিবারে এক ধরনের নেতৃত্বের চর্চা করে থাকেন, যা সাধারণত আমাদের চোখে পড়ে না বা আমরা তাকে নেতৃত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দিই না। একটি সংসারের আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখা বা বাজেট পরিচালনা করা, পারিবারিক সংকটের সময় ধৈর্যের সাথে তা মোকাবিলা করা, সন্তানদের শিক্ষার দিশা দেওয়া এবং সামাজিক সম্পর্কগুলো নিপুণভাবে বজায় রাখা—এই প্রতিটি কাজই কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক উপাদানের ক্ষুদ্র সংস্করণ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, পরিবারে নারীর এই অসামান্য দক্ষতাকে কেবল ‘সংসার ধর্ম’বা ‘স্বাভাবিক দায়িত্ব’হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এখানে একটি বড় ধরনের কাঠামোগত সমস্যা বিদ্যমান। পরিবারে নারীর দক্ষতাকে যখন দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়, তখন সেটি হয়ে যায় স্বাভাবিক; কিন্তু সেই একই নারী যখন বৃহত্তর রাজনীতিতে নিজের নেতৃত্বের দক্ষতা প্রমাণ করতে চান, তখন তাকে ‘অস্বাভাবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষী’হিসেবে নেতিবাচক তকমা দেওয়া হয়। এই দ্বিমুখী দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো না গেলে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে যেকোনো আলোচনা কেবল আংশিক এবং অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, নারীর নেতৃত্বের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উঠে আসে মূলত রাজনৈতিক পরিবারগুলো থেকে। এটি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠের মতো কাজ করে। একদিকে এটি নারীর জন্য রাজনীতির কঠিন দুয়ারগুলো সহজে খুলে দেয় এবং তাকে ক্ষমতার কেন্দ্রে যাওয়ার একটি সুযোগ করে দেয়। অন্যদিকে, এটি নেতৃত্বকে একটি নির্দিষ্ট বংশানুক্রমিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। বিভিন্ন গবেষণা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, রাজনৈতিক পরিবারের ছায়া তলে থাকা নারীরা অনেক সময় কেবল প্রতীকী নেতৃত্বেই সীমাবদ্ধ থাকেন। তারা ক্ষমতার আসনে বসে থাকলেও প্রায়ই স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে নিজের পরিচিতি গড়ে তুলতে পারেন না। ফলে পরিবার একদিকে যেমন নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে এটি নিয়ন্ত্রণের একটি অদৃশ্য কাঠামো হিসেবেও কাজ করে। এখান থেকেই প্রশ্ন ওঠে যে, আমরা কি সত্যিই একজন নারী নেত্রী তৈরি করছি, নাকি বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামোকে কেবল একটি নারী অবয়ব দিয়ে টিকিয়ে রাখছি?

নারীর প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন কেবল সংসদীয় আসনে সংখ্যা বাড়ানো বা কোটা ব্যবস্থার মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এটি মূলত একটি গভীর সাংস্কৃতিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রশ্ন। এই পরিবর্তনের সূচনা যদি পরিবার থেকে না হয়, তবে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নেওয়া কোনো সংস্কারই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই বা ফলপ্রসূ হবে না। যেসব পরিবারে কন্যাশিশুকে শুরু থেকেই নিজের মত প্রকাশে উৎসাহিত করা হয়, পারিবারিক ছোট-বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাকে যুক্ত করা হয় এবং নেতৃত্বকে লিঙ্গনিরপেক্ষ একটি মানবিক গুণ হিসেবে দেখা হয়, সেখান থেকেই আগামীর বলিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে সবচেয়ে বেশি। এটি কোনো নিছক তাত্ত্বিক কল্পনা নয়, বরং মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক গবেষণাও এই একই বাস্তবতাকে জোরালোভাবে সমর্থন করে। রাজনৈতিক সচেতনতা এবং নেতৃত্বের গুণাবলী কোনো জন্মগত বিষয় নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী লালন-পালনের প্রক্রিয়া যা ঘরের ভেতর থেকেই শুরু হয়।

পারিবারিক সামাজিকীকরণের গণ্ডি পেরিয়ে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে আরও শক্তিশালী করতে হলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, গণমাধ্যম এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাকেও নতুন করে সাজাতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, শিক্ষাব্যবস্থায় এমন একটি লিঙ্গসংবেদনশীল পাঠ্যক্রম প্রয়োজন যেখানে কেবল পুরুষ বীরদের কথা নয়, বরং নারী নেত্রীদের সংগ্রামের ইতিহাসও গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। একই সঙ্গে পাঠ্যপুস্তক ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে পরিবার ও সমাজে নারী–পুরুষের সমান দায়িত্ববোধের ধারণা তুলে ধরা জরুরি। যেমন, গৃহস্থালি কাজ ও পরিচর্যার দায়িত্ব কেবল নারীর নয়, পুরুষদেরও সক্রিয়ভাবে এসব কাজে যুক্ত হওয়া স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয় এই বার্তাটি শিক্ষার মাধ্যমে ছোটবেলা থেকেই প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এতে করে পুরুষতান্ত্রিক ও বিষাক্ত মানসিকতা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়বে এবং সমতার চর্চা গড়ে উঠবে। এক্ষেত্রে শিক্ষকদেরও সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে নারী শিক্ষার্থীরা নেতৃত্বকে সম্ভাব্য ও স্বাভাবিক একটি পথ হিসেবে দেখতে শেখে। পাশাপাশি গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো নারীর রাজনৈতিক অর্জনগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা এবং তাকে কেবল ‘নারী পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তার নেতৃত্ব, দক্ষতা ও সিদ্ধান্তগ্রহণের সক্ষমতার যথাযথ মূল্যায়ন করা। একইভাবে রাজনৈতিক দলগুলোরও প্রয়োজন নিজেদের অভ্যন্তরীণ কাঠামো ও চর্চায় লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করা, যাতে নারীর অংশগ্রহণ কেবল প্রতীকী না হয়ে বাস্তব ও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরেও আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। দলের অভ্যন্তরীণ প্রতিটি স্তরে যেন নারী সদস্যরা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং কেবল কোটা পূরণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত না হন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ বলে, যেখানে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক পরিবেশ নারীর মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, সেখানেই নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি কার্যকর এবং স্থায়ী হয়েছে।

বিভিন্ন গবেষণা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা কোনো আইনি জটিলতা নয়, বরং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা। পরিবারে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যমূলক সামাজিকীকরণ এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা যখন হাত ধরাধরি করে চলে, তখন তা নারীর রাজনৈতিক সত্তাকে শুরুতেই ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। অনেক সময় নিরাপত্তা ও পারিবারিক সম্মানের অজুহাতে পরিবারই নারীর রাজনীতিতে আসার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যথাযথ পারিবারিক সমর্থন এবং সচেতনতা ছাড়া রাষ্ট্রীয় যেকোনো বড় উদ্যোগ বা আইনি সংস্কারও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে। এটি স্পষ্টভাবেই প্রমাণ করে যে, নারীর ক্ষমতায়ন কোনো একক আইনি লড়াই নয়, বরং এটি পারিবারিক ও সামাজিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তনের একটি লড়াই।

সবশেষে বলা যায়, পরিবার নারীর জন্য যেমন অবারিত সম্ভাবনার দুয়ার হতে পারে, তেমনি হতে পারে তার জীবনের সবচেয়ে দুর্ভেদ্য দেয়াল। আমরা যদি সত্যিই রাষ্ট্র ও রাজনীতির কাঠামোতে গুণগত পরিবর্তন আনতে চাই, তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুটিকে বাইরে থেকে নিয়ে আসতে হবে ঘরের ভেতরে। প্রশ্নটি আজ সকলের সামনে অত্যন্ত স্পষ্ট—আমরা কি আমাদের পরিবারগুলোকে কেবল নারীর স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি পুরনো কাঠামো হিসেবেই টিকিয়ে রাখব, নাকি একে নারীর ক্ষমতায়ন ও নেতৃত্বের একটি শক্তিশালী এবং গর্বিত উৎস হিসেবে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করব? নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতার ভবিষ্যৎ আসলে নির্ভর করছে আমাদের নিজেদের পরিবারকে বোঝার এবং তাকে পুনর্গঠন করার সক্ষমতার ওপর। পরিবার যদি নেতৃত্বের শিক্ষা ও আত্মবিশ্বাসের একটি স্বীকৃত ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করতে পারে, তবেই সমাজ ও রাজনীতির কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর সম্ভব হবে এবং আমরা পাব বৈষম্যহীন, সমতার বাংলাদেশ। 

Shurat Rana Rushmi is a Research Associate at the Centre for Governance Studies. This blog was published as a part of the ongoing collaborative partnership project between the Embassy of the Kingdom of the Netherlands and the CGS under the project “Women and Youth Engagement in Politics in a Post-Uprising Bangladesh.”


Comments